ভারত-চীন সীমান্তে বাড়ছে উত্তেজনা, আবার সংঘাতের আশঙ্কা

0
41

তাইওয়ান প্রণালিতে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে চীন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এটাই ছিল বিশ্ব গণমাধ্যমের শিরোনাম। কিন্তু হাজার হাজার মাইল পশ্চিমে চীনের আরেক সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে তাইওয়ানের আগে ওই সীমান্তেই বিরোধ উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা বেশি।

প্রায় ১৬ মাস আগে চীন ও ভারতের সেনারা প্রাণঘাতী এক সংঘর্ষে জড়ান। হিমালয়ের পাদদেশে দুর্গম এলাকায় দুই দেশের সীমানা বিভাজনকারী প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলএসি) এই সংঘর্ষ কোনো অস্ত্র দিয়ে নয়, হয়েছিল পেশিশক্তি দিয়ে। পারমাণবিক ক্ষমতাধর দুই দেশের মধ্যে এই সীমান্ত বিতর্কিত এবং দুর্বলভাবে চিহ্নিত। এখন এটা নিয়ে উত্তেজনা আবার বাড়তে দেখা যাচ্ছে।

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা কেন
চীন ও ভারতের মধ্যবর্তী প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারের। এ নিয়ন্ত্রণরেখাকে ১৯৫৯ সালে চীন ‘ডি ফ্যাক্টো’ সীমান্তরেখা হিসেবে ঘোষণা করে। তবে এটি সুস্পষ্টভাবে দুই দেশের সীমানা চিহ্নিত করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থা এবং পর্বতসংকুল অঞ্চলে জরিপ ও সীমানা নির্ধারণে প্রতিকূলতা। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার আশপাশে গত এক দশকে দেশ দুটি কর্তৃক ব্যাপকভাবে রাস্তা, সেতু, রেল লিংক ও এয়ার ফিল্ড নির্মাণ করাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। গত বছর লাদাখে কেন্দ্রশাসিত সরকার প্রতিষ্ঠিত করার পর ভারত তার সামরিক ঘাঁটির সঙ্গে সংযুক্ত করে নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর একটি রাস্তা নির্মাণ করলে উত্তেজনা চরমে ওঠে।

প্রাণঘাতী সংঘর্ষ
অসমর্থিত কিছু প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দুই দেশের সেনারা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য একে অপরকে আটক করে রেখেছিলেন। সেখানে দুই দেশের সামরিক অবস্থান সুরক্ষিত। এদিকে উত্তেজনা কমাতে দুই পক্ষের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় তেমন কোনো অগ্রগতিও দেখা যাচ্ছে না।

দুর্গম এই পার্বত্য সীমান্ত অঞ্চল নিয়ে ১৯৬২ সাল যুদ্ধে জড়ায় ভারত-চীন। এরপর দুই দেশের মধ্যে সীমানা বিভাজনকারী রেখা এলএসি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে দুই দেশ তাদের অবস্থান নিয়ে কখনোই একমত হয়নি এবং উভয় পক্ষ প্রায়ই একে অপরের বিরুদ্ধে সীমান্ত অতিক্রম করার অভিযোগ তুলে আসছে। আবার উভয় পক্ষই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকার পরিসর বাড়াতে চায়। এ কারণে সময়ে সময়ে দুই পক্ষ নিজেদের অবস্থান নিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের জুনে এক সংঘর্ষ হয়, যা গত ৪০ বছরের মধ্যে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ।

ওই লড়াইয়ে ভারতের অন্তত ২০ জন ও ৪ জন চীনা সেনা নিহত হয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘস্থায়ী এই উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে দুই দেশের সামরিক নেতারা কয়েক দফা মুখোমুখি আলোচনা করেন এবং আলোচনার সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলমান।

আলোচনা নিয়ে একে অপরকে দোষারোপ
গত বছরের জুনের সংঘর্ষের পর এ পর্যন্ত ১৩ দফা সামরিক বৈঠক হয়েছে। সবশেষ বৈঠকটি হয়েছে গত রোববার। এবারের আলোচনার সমাপ্তি ভালো হয়নি। আগের আলোচনাগুলোয় সীমান্তে দুই পক্ষের দাবি নিয়ে সামান্য অগ্রগতি হলেও সবশেষ বৈঠকের পরদিন গত সোমবার ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় চীনের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা করার অভিযোগ তুলেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ভারত তার অবস্থান থেকে এটা দেখতে পেয়েছে যে, এলএসি বরাবর স্থিতাবস্থা নষ্ট হয়েছে চীনের একতরফা কার্যকলাপ এবং তাদের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি লঙ্ঘনের কারণে। কাজেই ভারতীয় পক্ষ বাকি এলাকাগুলোর সমস্যা সমাধানের জন্য গঠনমূলক পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু চীন রাজি হয়নি। এ ছাড়া চীনের পক্ষ থেকে কোনো দূরদর্শী প্রস্তাবও দেওয়া হয়নি।’

ত্রয়োদশ বৈঠকের আগে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নারাভানে বলেছিলেন, চীন এলএসির ওপারে সেনা না সরালে ভারতও সেনা সরাবে না। বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার ফলে ভারতও সেনাদের সতর্ক থাকার ওপর জোর দিয়েছে। ভারতীয় বাহিনীর ধারণা, এলএসিতে চীন ৬০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি জানা যাচ্ছে, ভারতের সেনাসংখ্যাও ৫০-৬০ হাজারের মতো।

বেইজিং অবশ্য এই পরিস্থিতিকে অন্যভাবে দেখছে। পিপলস লিবারেশন আর্মির ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের মুখপাত্র কর্নেল লং শাওহুয়া বলেন, ‘সীমান্ত পরিস্থিতি সহজ করতে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছে চীন। দুই সামরিক বাহিনীর মধ্যে সম্পর্কের সার্বিক পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য পুরো আন্তরিকতা প্রদর্শন করেছে। তবে, ভারত এখনো অযৌক্তিক ও অবাস্তব দাবিতে অটল। এতে আলোচনা আরও কঠিন হয়েছে।’
চীনের রাষ্ট্র পরিচালিত গ্লোবাল টাইমস ট্যাবলয়েডের একটি বিস্তৃত নিবন্ধে ‘সীমান্তের পূর্ব অংশে নতুন করে ঘটনা ঘটানো হচ্ছে’ বলে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে।

যদিও এ বছরের শুরুর দিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বেশ কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, সত্যিকার অর্থে অগ্রগতি হচ্ছে। উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবিতেও দেখা গিয়েছিল, সীমান্তে থাকা সেনা সমাবেশ সরাচ্ছে চীন। এতে করে ওই অঞ্চল থেকে বিশ্বের মনযোগ সরে যায়।

চীন যা বলছে
বিগত কয়েক সপ্তাহে ভারত ও চীনের গণমাধ্যমগুলো প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় নতুন করে দ্বন্দ্বের খবর প্রকাশ করে। তবে এসব তথ্যের বিশ্বস্ত কোনো সূত্রের উল্লেখ ছিল না। যদিও বলা হচ্ছে, এসব সমস্যাগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

গ্লোবাল টাইমস বলেছে, সেনাদের এমন মুখোমুখি অবস্থানের কারণে সীমান্তে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। তবে গ্লোবাল টাইমসের এই প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিশেষজ্ঞরা নতুন করে সংঘাত শুরুর ঝুঁকির ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, চীনের শুধু ভারতের ঔদ্ধত্য চাওয়াগুলো প্রত্যাখ্যান করলেই চলবে না, ভারতের নয়া সামরিক আগ্রাসন থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’
গ্লোবাল টাইমসের এর আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কিছুদিন আগেই ওই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা চীনের পিএলএর সেনারা প্রাত্যহিক কাজের পরিবেশকে উদ্বেগজনক বর্ণনা করে সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছিলেন। ওই প্রতিবেদনে সীমান্ত অঞ্চলে চীনের নতুন অবকাঠামো নির্মাণের খবরও জানানো হয়েছিল।

চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি আবার কেন উত্তপ্ত হচ্ছে, এমন প্রশ্নের পক্ষপাতদুষ্ট জবাব মিলছে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে। একইভাবে তাইওয়ানের সঙ্গে উত্তেজনা নিয়েও মত দেওয়া হয়ে থাকে। গত এক মাসে তাইওয়ানে দেড় শতাধিক চীনা যুদ্ধবিমানে মহড়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আঙুল তুলেছিল গ্লোবাল টাইমস।

চীনের ফুডান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক লিন মিনওয়াংকে উদ্ধৃত করে গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, ‘ভারত দেখছে যে, নয়াদিল্লিকে খুব গুরুত্ব দেয় ওয়াশিংটন। জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রায়ই ভারত সরকারের সঙ্গে কথা বলেন এবং যৌথভাবে চীনের প্রভাব ও সমৃদ্ধি ঠেকানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনাও করেছেন।’

চীন যেখানে হুমকির প্রতিশব্দ
বাইডেন এবং অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গত মাসে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি আলোচনা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁদের মধ্যে চতুর্পক্ষীয় নিরাপত্তা নিয়ে সংলাপ হয়, যা ‘কোয়াড’ জোট নামে বেশি পরিচিত। এটা হলো চার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিক কৌশলগত একটি ফোরাম, যার লক্ষ্য এশিয়ায় চীনের আধিপত্য ও বিস্তার ঠেকানো।

কোয়াড নেতাদের ওই বৈঠকের পরপরই চীনের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের অধ্যাপক লি হাইদং বলেছেন, কোয়াড সদস্যরা ‘চীন হুমকি’ তত্ত্বকে উড়িয়ে দেওয়া বন্ধ করবে না।

এ মাসের শুরুতে চীনা পিএলএর বিমানবাহিনী তাইওয়ানের আকাশসীমায় মহড়া দেওয়ার পর গ্লোবাল টাইমস লিখেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান স্বশাসিত দ্বীপটিকে নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। এতে করে যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরুর মতো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এদিকে সীমান্তে চলমান অস্থিরতা নিয়ে গত সোমবার চীনের গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনের এক শিরোনামে বলা হয়, পিপলস লিবারেশন আর্মির সীমান্তরক্ষী সেনারা আসন্ন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।

তাইওয়ান ও হিমালয়ের দূরত্ব প্রায় ২ হাজার ৮০০ মাইল বা সাড়ে ৪ হাজার কিলোমিটারের। দুই অঞ্চলের পরিবেশও সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু এ দুই এলাকা নিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রতিবেশীদের দ্বন্দ্ব রয়েছে। দুই অঞ্চলেই পরিস্থিতি দিন দিন উত্তপ্ত হচ্ছে এবং চীনের দাবি, এসবের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here